অভাবের কারণে সহায় সম্বল বিক্রি ও ধারদেনা করে ১০ বছর আগে বাংলাদেশ থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত পাড়ি দিয়েছিলেন আব্দুল কাদের। সেখানে ক্রেন অপারেটরের কাজ করেন তিনি।

কিন্তু ১০ বছর দুবাইয়ে কাজ করে ব্যাংকে টাকা জমানো তো দূর, একটি ব্যাংক হিসাব খোলারও সুযোগ হয়নি তার। থাকা-খাওয়ার খরচ বাদ দিয়ে মজুরির প্রতিটি পয়সা তাকে পাঠাতে হয় বাংলাদেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের কাছে।

দরিদ্র এই শ্রমজীবী আব্দুল কাদেরই ১৩ অক্টোবর বুধবার লটারিতে জিতেছেন ১০ লক্ষ দিরহাম, বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২ কোটি ৩২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক দৈনিক খালিজ টাইমস বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে এ তথ্য।

খালিজ টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুবাইভিত্তিক লটারি আয়োজন প্রতিষ্ঠান মাহজুজের একটি টিকেট কিনেছিলেন আব্দুল কাদের।

বুধবার ড্রয়ের পর দেখা যায়, বিজয়ীদের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছেন কাদের। ওই লটারিতে দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারীর জন্য পুরস্কার হিসেবে বরাদ্দ করা ছিল ১০ লাখ দিরহাম।

খালিজ টাইমসকে কাদের জানান, লটারিতে দ্বিতীয় স্থান জয়ের পর আবেগে-উত্তেজনায় তাৎক্ষনিকভাবে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, ‘আমি আসলে এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না যে, ১০ লাখের মধ্যে কতগুলো শূণ্য থাকে। যতদিন ধরে দুবাইয়ে আছি, থাকা-খাওয়ার খরচ বাদে প্রতিটি দিরহাম বাংলাদেশে পাঠাতে হয়েছে আমাকে।’

কাদের আরও জানান, দেশে পাঠানো টাকায় যেন টান না পড়ে, সেজন্য ফোনে ইন্টারনেট সংযোগবাবদও নিয়মিত অর্থ ব্যয় করেন না তিনি।

‘গতরাতে যখন ওই ড্র অনুষ্ঠান লাইভ প্রচার হচ্ছিল, আমি নাইটশিফটে কাজ করছিলাম। ফোনে সেই অনুষ্ঠান দেখার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু পর্যাপ্ত ইন্টারনেট ডাটা না থাকার কারণে বার বার বাফারিং হচ্ছিল।’

‘শেষ পর্যন্ত আমার এক বন্ধুকে ড্রয়ের ফলাফল চেক করার অনুরোধ করি। সেই জানিয়েছে- দ্বিতীয় পুরস্কার জিতেছি আমি।’

দুই সন্তানের পিতা আব্দুল কাদের জানিয়েছেন, পুরস্কার জেতার খবর শোনার পর প্রথমেই তার মনে পড়েছে স্ত্রীর কথা।

নিজের স্ত্রীকে খুবই ধৈর্যশীল ও সহানুভূতিসম্পন্ন নারী হিসেবে উল্লেখ করে কাদের বলেন, ‘টাকা পাওয়ার পর আমি প্রথমেই স্বর্ণের দোকানে যাব এবং তার জন্য কিছু স্বণালঙ্কার কিনব। গত ১০ বছর ধরে দুবাই আছি, কিন্তু এতদিনে তাকে এক রতি স্বর্ণও উপহার দিতে পারিনি।’

নিঃস্বার্থ এই শ্রমিক আরও বলেন, পুরস্কারের টাকার একটা অংশ বাবা ও ভাইকে দেবেন তিনি, যারা গত কয়েক বছর ধরে ব্যাপক অর্থকষ্টে রয়েছেন।

বাকি টাকা দিয়ে একটি বাড়ি নির্মাণ করবেন এবং তা ভাড়া দেবেন। এক্ষেত্রে তার যুক্তি হলো- যদি একটি বাড়ি নির্মাণ করে তা ভাড়া দেওয়া যায়, সেক্ষেত্রে তার পরিবারের সদস্যদের জন্য একটি নিশ্চিত আয়ের উৎস তৈরি হবে।

পুরস্কারের অর্থের বাকি অংশ সন্তানদের শিক্ষার জন্য তুলে রাখা হবে উল্লেখ করে খালিজ টাইমসকে কাদের বলেন, ‘অভাবের কারণে পড়াশোনা করতে পারিনি। ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়ার পর স্কুল ছেড়ে দিয়ে কাজে নামতে হয়েছে।’

‘কিন্তু আমি চাই না আমার সন্তানদের পরিণতিও আমার মতো হোক। লেখাপড়া শিখে তারা যেন মানুষের মতো মানুষ হয়, এই টাকার একটি অংশ সেজন্য বরাদ্দ থাকবে।’ সূত্রঃ -খালিজ টাইমস, ঢাকা পোস্ট